রক্ত শূন্য হচ্ছে আমার দেশ!

গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট ২০১৭ অনুসারে এদেশের প্রায় ৫১ শতাংশ মহিলাই রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন।

By Nayan

একটু একটু করে শুকিয়ে যাচ্ছে শরীরটা। তেজ হারাচ্ছে রক্ত স্রোতও। তাই তো প্লাস্টিক প্যাকেটে রক্ত ভরে দাঁড়িয়ে ওঁরা। দীর্ঘ লাইন। সঙ্গী ওদের চড়া রোদ। তবু শীর্ণ শরীরগুলো লাইন ছাড়তে নারাজ। বাঁচতে হবে যে! এ ছবি শুধু গ্রামের নয়, শহরেরও। তবে প্রতিষ্টানটা আলাদ বৈকি। গ্রামের লাইন যেখানে স্বাস্থ্য কেন্দ্র মুখি। শহর সেখানে অপেক্ষায় এসি হাসপাতালের বাইরে। কিন্তু শরীরের অন্দরের ছবিটা পল্টায়নি একটুকুও।

আমাদের দেশের সিংহভাগ মহিলার শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্তের দেখা মেলে না, এমনটাই দাবী করা হয়েছে সম্প্রতি একটি রিপোর্টে। বেশ কয়েকদিন আগে প্রকাশিত গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট ২০১৭ অনুসারে এদেশের প্রায় ৫১ শতাংশ মহিলাই রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন। শুধু তাই নয়, অ্যানিমিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে সারা বিশ্বকে পিছনে ফেলে দিয়েছে আমাদের দেশে, যা বাস্তবিকই লজ্জার বিষয়।

গত বছর জেনেভায় হওয়া ওয়ার্ল্ড হেল্থ অ্যাসেম্বলিতে সেট করা টার্গেটের বিচারে সারা বিশ্বের ১৪০ দেশের মধ্যে ভারতের জনগণ সবথেকে বেশি অপুষ্টির শিকার। যে কারণেই অ্যানিমিয়ার মতো রোগের প্রকোপ এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রসঙ্গত, গত বছর ঠিক এই একই সময় সংগ্রহ করা ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সে বছর অ্যানিমিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ, যা এ বছর প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। তাই একথা নিশ্চয় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে ক্রমশ আমাদের দেশের মহিলারা শকিয়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে, যা বাস্তবিকই ভয়ের বিষয়। তাই তো এমন পরিস্থিতিতে সচেতন হয়ে ওঠাটা একান্ত প্রয়োজন। আর সেই কারণেই তো আজকের এই প্রবন্ধটি লেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এই লেখায় এমন কিছু ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যা মেনে চললে অ্যানিমিয়ার সঙ্গে লড়াইটা কঠিন হবে না। তাই আমাদের দেশের মহিলা নাগরিকদের কাছে অনুরোধ, দয়াকরে একবার এই প্রবন্ধে চোখ রাখুন। কারণ অ্যানিমিয়া রোগকে কোনও ভাবেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। তাই তো সময় থাকতে থাকতে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বৈকি। প্রসঙ্গত, অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হলে সাধারণত যে যে লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়, সেগুলি হল- ক্রনিক ক্লান্তি, ত্বকের সৌন্দর্য হারিয়ে যাওয়া, মারাত্মক চুল পরা, হার্ট রেট বেড়ে যাওয়া, শ্বাস কষ্ট, মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া প্রভৃতি।

এক্ষেত্রে যে যে নিময়গুলি মেনে চললে উপকার পাওয়া যায়, সেগুলি হল...

১. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে:

১. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে:

অ্যানিমিয়ার আক্রান্ত হলে প্রথমেই শরীরে যে ক্ষতিটা হয়, তা হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে দুর্বল হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। সেই কারণেই তো এই সময় বেশি করে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কারণ এই ভিটামিনটি শরীরকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে তোলে। সেই সঙ্গে পুষ্টির ঘাটতিও দূর করে। প্রসঙ্গত, সাইট্রাস ফল যেমন পাতি লেবু, মৌসাম্বি লেবু, কমলা লেবু প্রভৃতিতে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন সি মজুত থাকে। তাই প্রতিদিন এই ফলগুলির কোনওটি খেতেই হবে। আর যদি এমনটা করার সময় না থাকে, তাহলে নিয়মিত লেবু জল পান করলেও চলবে।

২. দই এবং হলুদ:

২. দই এবং হলুদ:

বেশ কিছু আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ থেকে এমনটা জানতে পারা গেছে যে অ্যানিমিকরা যদি দিনে দুবার, সকালে এবং দুপুরে, অল্প পরিমাণ হলুদ মিশিয়ে এক বাটি করে দই খেতে পারেন, তাহলে দারুন উপকার মেলে। আসলে দই এবং হলুদে উপস্থিত নানাবিধ উপকারি উপাদান শরীরে প্রবেশ করার পর একাধিক পুষ্টিকর উপাদানের ঘাটতি মেটাতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই রোগের প্রকোপ কমে।

৩. প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে সবুজ শাক-সবজি:

৩. প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে সবুজ শাক-সবজি:

পালং শাক, সেলারি, সরষে শাক এবং ব্রকলির মতো সবুজ শাক-সবজিতে মজুত থাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, যা শরীরে লহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাড়িয়ে রক্তাল্পতা দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

৪. বিট রুট এবং বেদানার রস:

৪. বিট রুট এবং বেদানার রস:

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত বিটরুটের জুস এবং একটা করে অপেল খাওয়া যায়, তাহলে অ্যানিমিয়ার প্রকোপ দ্রুত কমতে শুরু করে। আসলে বিটরুটে উপস্থিত ফলিক অ্যাসিড এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। অন্যদিকে, বেদানার রসে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় আয়রন, কপার এবং পটাশিয়াম। এই সবকটি উপাদান রক্তাঅল্পতা দূর করার পাশাপাশি শরীরের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

৫. তামার পাত্রে জল পান জরুরি:

৫. তামার পাত্রে জল পান জরুরি:

আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে সারা রাত তামার গ্লাসে জল রেখে পরদিন সকালে খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় খনিজের ঘাটতি দূর হয়। ফলে অ্যানিমিয়ার মতো রোগ সারতে সময় নেয় না। প্রসঙ্গত, নিয়মিত তামার গ্লাসে জল খেলে চুল পরার মতো সমস্যাও কমতে শুরু করে।

৬. তিল বীজ:

৬. তিল বীজ:

অ্যানিমিয়াকে যুদ্ধে হারাতে হলে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে হবে। তাই তো অ্যানিমিকদের রোজের ডায়েটে অবশ্যই রাখতে হবে তীল বীজকে। কারণ এই প্রাকৃতিক উপাদানটির শরীরে প্রচুর মাত্রায় আয়রন মজুত থাকে, যা শরীরে এই খনিজটির ঘাটতি মিটিয়ে অ্যানিমিয়ার প্রকোপ কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রসঙ্গত, এক্ষেত্রে প্রথমে পরিমাণ মতো তিল বীজ নিয়ে কম করে ২-৩ ঘন্টা জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সময় হয়ে গেলে বীজগুলি বেটে একটা পেস্ট বানিয়ে সেই পেস্টের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেতে হবে।

৭. খেজুর:

৭. খেজুর:

এতে উপস্থিত ভিটামিন সি এবং আয়রন একদিকে যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নতি ঘটিয়ে শরীরের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে, তেমনি লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন বাড়িয়ে অ্যানিমিয়ার প্রকোপ কমাতেও বিশেষভাবে সাহায্য করে। এখানেই শেষ নয়, ক্লান্তি দূর করে শরীরকে চনমনে করে তুলতেও খেজুরের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। তাই তো সুস্থ থাকতে ভারতীয় মহিলাদের প্রতিদিন ২-৩ টে করে খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তাকেন চিকিৎসকেরা।

Story first published: Tuesday, November 7, 2017, 10:38 [IST]
X
Desktop Bottom Promotion