জন্মাষ্টমী : জেনে নিন পুজোর দিন, সময়, পুজো বিধি

"যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত , অভ্যূত্থানম ধর্মস্য তদাতনং সৃজাম্যহম..."- শ্রীকৃষ্ণের এই বিখ্যাত বাণী যুগ যুগ ধরে লোকমুখে প্রচারিত হয়ে আসছে। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার লক্ষ্যে মহাবতার ভগবান রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সেই উপলক্ষ্যে প্রতিবছর শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথিতে পালন করা হয় জন্মাষ্টমী। এইবছর ২৩ অগাষ্ট ও ২৪ অগাষ্ট অর্থাৎ দু'দিন জন্মাষ্টমী। ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার হয়ে শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন মাতা দেবকীর গর্ভে। হিন্দু-ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে এইদিন গোপাল পুজোর আয়োজন হয়। দুধ-ঘি-মধুতে স্নান সেরে নতুন জামা, গয়না পরে, ফুল-চন্দন-আতরে আজ সেজে ওঠেন আমাদের সকলের প্রিয় গোবর্ধনধারী । এইদিন মহিলারা বাড়ির দরজার বাইরে, রান্নাঘরে শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন এঁকে দেন যা শ্রীকৃষ্ণের যাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

krishna

ইতিহাস :
শ্রীকৃষ্ণের জন্মের সময় চারিদিকে অরাজকতা, নিপীড়ন, অত্যাচার চরম পর্যায়ে ছিল। সেই সময় মানুষের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সর্বত্র ছিল অশুভ শক্তির বিস্তার। তিনি সেই অশুভ শক্তির বিনাশ করতে জন্ম নিয়েছিলেন মানব রুপে। মথুরায় মাতা দেবকী ও পিতা বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু, তাঁর মামা কংস ছিলেন খুব অত্যাচারী রাজা। তাই, মামার হাত থেকে বাঁচাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের রাতেই তাঁর পিতা বাসুদেব তাঁকে যমুনা নদী পার করে গোকুলে পালক মাতা যশোদা ও পিতা নন্দ-র কাছে রেখে আসেন। সেখানেই বড় হতে থাকেন শ্রীকৃষ্ণ। ছোটোবেলায় তাঁকে সবাই আদর করে গোপাল বলে ডাকত। তিনি গোবর্ধন পর্বতকে এক আঙুলে তুলেছিলেন বলে তাঁর আর এক নাম গোবর্ধন।

হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৈষ্ণবদের কাছে জন্মাষ্টমী একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসব নানা ভাবে উদযাপন করা হয়, যেমন - রাসলীলা বা কৃষ্ণলীলা, ধর্মীয় গীত গাওয়া, উপবাস, দহি হান্ডি প্রভৃতি। রাসলীলা-তে মূলত শ্রীকৃষ্ণের ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা দেখানো হয়। অন্যদিকে, দহি হান্ডি প্রথায় অনেক উঁচুতে মাখনের হাঁড়ি রাখা হয় এবং অনেক ছেলে মিলে একে অপরের উপর উঠে মানুষের পিরামিড তৈরি করে সেই হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করে।

জন্মাষ্টমীর দিন ও সময় :
এবছর জন্মাষ্টমী পড়েছে দু'দিন। ইংরাজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ২৩ অগস্ট আর ২৪ অগস্ট - এই দু'দিনই জন্মাষ্টমী। অষ্টমী তিথি শুরু হচ্ছে ২৩ অগাস্ট সকাল ৮টা ৯ মিনিটে। আর, অষ্টমী তিথি চলবে ২৪ আগস্ট সকাল ৮ টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত।

পুজো করার নিয়ম :
শাস্ত্র মতে, গোপালের মূর্তিতে দুধ মধু সহকারে তাঁকে স্নান করান। এরপর নতুন বস্ত্র পরিয়ে ক্ষীর জাতীয় খাবার গোপালকে অর্পণ করুন। দুধের তৈরি যেকোনও দ্রব্যের সঙ্গে এদিন পুজো করার বিধি প্রচলিত। ঘরে মঙ্গলের জন্য রাখতে পারেন ময়ূরের পালকও।

ব্রত পালনের প্রথম পর্যায়ে ফুল, আতপ চাল, ফলের নৈবেদ্য, তুলসীপাতা, দূর্বা, ধূপ, প্রদীপ, পঞ্চগব্য, পঞ্চগুড়ি, পাট, বালি, পঞ্চবর্ণের গুড়ো, মধুপর্কের বাটি, আসন-অঙ্গুরী এগুলি সংগ্রহ করতে হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, ব্রতের সারাদিন উপবাস থেকে এই উপকরণগুলি দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পুজো করতে হয়। ব্রতভঙ্গের পর নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হয়।

কী কী রাখবেন জন্মাষ্টমীর ভোগে ?
আমরা সকলেই জানি যে শ্রীকৃষ্ণ দুধজাতীয় খাবার খেতে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তিনি গোকুলের প্রায় সমস্ত বাড়ি থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে এগুলি খেতেন। তাই, শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় খাবারগুলি তাঁর পুজোতে তাঁকে উত্সর্গ করা উচিত। দুধের মিষ্টি যেমন রাবড়ি, খির, পেদা, গোপালকলা, মিষ্টি দই, কালাকাঁন্দ প্রভৃতি ভগবান কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় কয়েকটি খাবার। তাই এগুলো তাঁর পুজোয় রাখা উচিত। এছাড়াও যে যে খাবার তাঁর পুজোয় অবশ্যই নৈবেদ্য উৎসর্গ করবেন -

মাখন - জন্মাষ্টমীর পুজোতে বিশেষ ভোগ হিসেবে মাখন থাকতেই হবে। ছোট থেকেই কৃষ্ণ মাখন খেতে পছন্দ করেন, এমন অনেক গল্প আমরা শুনেছি।

চরণামৃত - ঘি, দুধ, মধু , দই, গুড় দিয়ে তৈরি চরণামৃত শ্রীকৃষ্ণের মূল প্রসাদ হিসেবে নিবেদন করা বাঞ্ছনীয়।

খির বা পায়েস - তবে পুজোতে খির বা পায়েস থাকাও বাধ্যতামূলক।

লাড্ডু - লাড্ডু ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের পুজো হবেই না। তাই জন্মষ্টমীতে লাড্ডু থাকা বাধ্যতামূলক।

X
Desktop Bottom Promotion