কোনও বাচ্চা যাতে ক্ষিদে পেটে না থাকে তার জন্য উনি ভিক্ষা করেন!

একটা গল্পের আড়ালে যেন লুকিয়ে হাজারো গল্প। এই গল্প ৬৮ বছরের একজন মহারাষ্ট্রীয়ান মহিলার। যাঁর রুজি রুটি হল ভিক্ষাবৃত্তি। কিন্তু এ কাজ তিনি নিজের জন্য করেন না। করেন হাজারো বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দোওয়ার জন্য। যেখানে আমরা কোটি কোটি টাকা কামিয়েও সমাজের কিছু ফিরিয়ে দিতে পারিনা। সেখানে স্বামী পরিত্যক্তা এক নারী দিন রাত দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করেও সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেন। এর থেকে মহান কাজ আর কী কিছু হতে পারে!

সিন্ধুতাই সাপকাল। এটা শুধু একটা নাম নয়। আত্মবিশ্বাসের আধুনিক নির্দশন বলা যেতে পারে। ছোট বয়স থেকেই কষ্টে বড় হতে থাকা মানুষটার হঠাৎই বিয়ে হয়ে যায়। বয়স তখন মাত্র ১০। তবু সে স্বপ্ন দেখে। এবার হয়তো বদলাবে জীবন। কিন্তু বিধাতার লিখনে যে অন্য কিছু ছিল। স্বামীর সংসারেও সুখ পেলেন না সিন্ধুতাই। প্রথমে দৈহিক অত্যাচার। তারপর একদিন অন্য এক নারীর টানে সিন্ধুতাইকে ছেড়ে চলে গেল তার স্বামী। এদিকে ততদিন তার পেটে বাচ্চা। কী করে সংসার চলবে। বাচ্চাকে খাওয়াবেনই বা কী! কোনও উপায় না পেয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই শুরু করলেন ভিক্ষা চাওয়া। অল্প কিছু রোজগার হতে শুরু করল। এদিকে একদিন হঠাৎ পেটে মারাত্মক যন্ত্রণা। চিৎকার করে গলার শিরা ছিড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তবু কেউ এগিয়ে আসছিল না সাহায্যের জন্য। এই করতে করতেই কাছের এক খাটালে মেয়ে সন্তানের জন্ম দিলেন সিন্ধুতাই। তারপর পরেও থেমে থাকল না ভিক্ষাবৃত্তি। রাত দিন চলল লড়াই। এই সময় তিনি উপলব্ধি করলেন, তিনি একা নন, তার মতো আরও অনেকে এমনভাবে না খেয়ে কোনও মতে প্রাণটাকে ছেঁড়া কাপড়ের মধ্যে চেপে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন, তাদেরও সাহায্য করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? নিজের আর মেয়েরই পেট চলে না, বাকিদের জন্য কীভাবে করবেন!

"দা মাদার অব অরফ্যান":

কথায় আছে না ইচ্ছা থাকলেই ঠিকই উপায় হয়! আরও জোর কদমে ভিক্ষা করা শুরু করলেন সিন্ধুতাই। তাঁকে যে অনেক পুঁজি জোগাড় করতে হবে। সেই সঙ্গে শুরু হল রাস্তায় পরে থাকা অনাথ শিশুদের খোঁজ। এই করতে গিয়ে জুটেও গেল কয়েক জন। নিজের মেয়ের পাশাপাশি তাদেরও মুখে উঠতে শুরু করল খাবার। এই করতে করতে আজ পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ অনাথ ছেলে মেয়েকে ভালবাসা দিয়ে বড় করে তুলছেন সিন্ধুতাই। তাদের খাওয়া ব্য়বস্থা তো করেছেনই, সেই সঙ্গে সব বাচ্চারাই যাতে পড়াশোনার করার সুযোগ পায় সেদিকেও খেয়াল রেখেছেন। শুনলে হয়তো অবাক হয়ে যাবেন ২০ বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া এই প্রচেষ্টা এখন প্রায় ৫০ বছরের দোর গোড়ার এসে দাঁড়িয়েছে। আর এই দীর্ঘ সময়ে রাস্তায় পরে থাকা অনাথদের মধ্যেই কেউ কেউ সিন্ধুতাই সাপকালের ভালবাসার ছাঁয়ায় বড় হয়ে উঠে হয়েছেন আইনজীবী, তো কেউ ডাক্তার। ভাবতে পারেন! লিখতে লিখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! হয়তো পড়তে পড়তে একই অনুভূতি আপনাদেরও হবে।

Image Source

এখানেই শেষ নয়:

এখানেই শেষ নয়:

তার ছত্রছায়ায় বড় হয়ে ওঠা বাচ্চাদের যাতে কোনও দিন এটা মনে না হয় যে সিন্ধুতাই বাকিদের থেকে নিজের মেয়েকে বেশি ভালবাসেন, তাই ছোট থাকতে থাকতেই মেয়েকে পুনার বাসিন্দা শ্রিমন্ত ডাগডু শেত হালোয়াইকে দিয়ে দিন। সেই মেয়ে এখন বড় হয়ে মায়ের মতো নিজেও অনাথ আশ্রম চালাচ্ছেন।

Image Source

সম্মানও পয়েছেন অনেক:

সম্মানও পয়েছেন অনেক:

আজও তিনি তার ভালবাসার ছেলে-মেয়েদের ভাল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এই মহান কাজের জন্য পয়েছেন প্রায় ৫০০-এরও বেশি পুরষ্কার। আর পুরষ্কারের সঙ্গে যে অর্থ পয়েছেন তা দিয়ে অনাথ আশ্রম তৈরি করেছেন। যদিও কাজ এখনও চলছে। হয়তো আগামী দিনেও চলবে। কারণ টাকার অভাব এখনও দূর হয়নি। তবু লড়াই চলছে... লড়াই চলবে।

Image Source

"মে সিন্ধুতাই সাপকেল":

তার জীবনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই নামে একটি মারাঠি সিনেমাও তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় পুরষ্কারেও পয়েছে। কিন্তু এর পরেও মহারাষ্ট্র সরকারের তরফ থেকে কোনও সাহায্য আসেনি সিন্ধুতাইয়ের কাছে। তবে তাই বলে অভিযান থেমে থাকেনি। কারণ ৬৮ বছরের এই মহিলা এইসব নিয়ে তোয়াক্কাই করেন না। তার একটাই লক্ষ, কোনও অনাথ যেন না খেয়ে ঘুমতে না যায়।

Image Source

Story first published: Saturday, July 8, 2017, 15:03 [IST]
X
Desktop Bottom Promotion