Bappi Lahiri : কেন অলকেশ থেকে বাপ্পি হয়েছিলেন? জেনে নিন তাঁর জীবনের অজানা কিছু কথা

লতা মঙ্গেশকের মৃত্যুর শোক এখনও তরতাজা, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি বাঙালি। এরই মাঝে বুধবার কাকভোরে দুসংবাদ এলো 'ডিস্কো কিং' আর নেই! আরও এক কিংবদন্তির মৃত্যু। মঙ্গলবার মধ্যরাতে মুম্বইয়ের জুহুর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

গত বছর এপ্রিলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বাপ্পি লাহিড়ি। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে বাড়িও ফেরেন। মঙ্গলবার মধ্যরাতে 'অবসট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া'-য় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিখ্যাত সুরকার ও গায়ক। জুহুর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যু হয় তাঁর। হাসপাতাল সূত্রে খবর, গত প্রায় একমাস তিনি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সোমবারই একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, কিন্তু মঙ্গলবার ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দেশ।

facts about King of Disco Bappi Lahiri

১) ১৯৫২ সালের ২৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বাপ্পি লাহিড়ি। জন্মসূত্রে নাম ছিল অলকেশ লাহিড়ি। সিনেমার জগতে আসার পরে নাম নেন 'বাপ্পি'। সেই নামেই তাঁর ভুবনজোড়া খ্যাতি।

২) বাবা অপরেশ লাহিড়ি ও মা বাঁশরী লাহিড়ি, দুজনেই গানের জগতের মানুষ ছিলেন। তাই, সঙ্গীত জগতের সঙ্গে ছোটো থেকেই পরিচিত ছিলেন বাপ্পি। বাড়ির পরিবেশ গানের সুরে ভরপুর ছিল।

৩) পিতা-মাতার সান্নিধ্যেই সঙ্গীতে তাঁর হাতেখড়ি। খুব ছোটো থেকেই তবলা বাজাতে ভীষণ ভালবাসতেন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকে তবলা বাজাতেন তিনি। পরবর্তীকালে ড্রামস, পিয়ানো, গিটার, স্যাক্সোফোন, ঢোলকের মতো অজস্র বাদ্য বাজানোয় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। স্বয়ং কিশোর কুমার সম্পর্কে বাপ্পি লাহিড়ির মামা। চলচ্চিত্র জগতে কাজ করতে আসার সুযোগ হয়েছিল মামার কারণেই।

৪) ১৯৭২ সালে, ১৯ বছর বয়সে 'দাদু' নামক বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা করেন বাপ্পি। এরপর তিনি মুম্বই পাড়ি দেন। সেখানেই গড়ে তোলেন চোখ ধাঁধানো কেরিয়ার। বলিউডে একের পর এক দুর্দান্ত সব গান বানিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন।

৫) বলিউডে তাঁর প্রথম কাজ ছিল 'নানহা শিকারি' (১৯৭৩) ছবিতে। এই ছবির গীতিকারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর পরিচালক তাহির হুসন-এর 'জখমি' ছবিতে গান লেখার পাশাপাশি গেয়েওছিলেন।

৬) আশি-নব্বইয়ের দশকে সুরে, গানে বলিউডে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বাপ্পি। একের পর এক হিন্দি ছবিতে তাঁর কম্পোজ করা সুর, গানে বুঁদ হয়েছে আসমুদ্রহিমাচল। কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে থেকে ঊষা উত্থুপ, অনেক রথী-মহারথীদের সঙ্গে কাজ করেছেন বাপ্পি লাহিড়ি। সেই সময় মিঠুন চক্রবর্তীর ছবিতে বাপ্পিদার গান, সুপারহিট জুটি হয়ে গিয়েছিল। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু বলিউডের বহু তারকা তাঁর সুরে গলা মিলিয়েছেন।

৭) মিঠুন চক্রবর্তীর 'ডিস্কো ডান্সার' ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করে রাতারাতি সুপারস্টারে পরিণত হন বাপ্পি লাহিড়ি। ভারতীয় সিনেমায় ডিস্কো মিউজিকের ব্যবহার তাঁর মতো করে আগে কেউ কোনওদিন করেনি। এরপর বাপ্পি লাহিড়ি-র জনপ্রিয়তা ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও। 'ডিস্কো কিং' নামে পরিচিতি লাভ করেন এই বাঙালি গায়ক। আজও তাঁর 'ডিস্কো ডান্সার' গানের তালে নেচে ওঠেন সকলে।

৮) ডিস্কো ড্যান্সার, চলতে চলতে, কমাণ্ডো, সুরক্ষা, ইলজাম, ড্যান্স ড্যান্স, ফিল্ম হি ফিল্ম, নমক হালাল, সাহেব, ওয়ারদাত, টারজান, কসম পয়দা করনে ওয়ালে কি, আপ কি খাতির, সত্যমেব জয়তে, কম্যান্ডো, অজস্র ছবির সুপারহিট গানের স্রষ্টা তিনি।

৯) 'ইয়াদ আ রাহা হ্যায়', 'জাওয়ানি জানে মন', 'রাত বাকি বাত বাকি', 'ডিস্কো ডান্সার', 'উলালা উলালা', 'চলতে চলতে', 'বোম্বাই সে আয়া মেরা দোস্ত', 'বোম্বাই নাগারিয়া', 'জিমি জিমি আজা আজা', একাধিক সুপারহিট গান বলিউডকে উপহার দিয়েছেন বাপ্পি লাহিড়ি। অমিতাভ বচ্চনের 'শরাবি' ছবির জন্য পেয়েছিলেন বেস্ট মিউজিক ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড।

১০) তাঁর হিন্দি কথায় বাংলা উচ্চারণের ছাপ ছিল স্পষ্ট। 'অমর সঙ্গী', 'আশা ও ভালবাসা', 'ওগো বধু সুন্দরী', 'আমার তুমি'-র মতো বহু বাংলা ছবিতে সুর দেওয়ার পাশাপাশি গায়ক হিসেবেও সুপারহিট বাপ্পিদা। তবে বাংলার থেকে হিন্দিতেই বেশি কাজ করেছেন।

১১) কেবল সঙ্গীত পরিচালনাই নয়, গায়ক হিসেবেও বাপ্পি লাহিড়ির জনপ্রিয়তা কম ছিল না। দীর্ঘদিন বাংলা ও হিন্দি ছবির গান গেয়েছেন। সুর দিয়েছেন। ডিস্কো সঙ্গীতের পাশাপাশি, বেশ কিছু গজল গানও রচনা করেছেন তিনি।

১২) গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও নাম উঠেছিল তাঁর বছরে সর্বাধিক গানের রেকর্ডের জন্য। ১৯৮৬ সালে ৩৩টি ছবির জন্য ১৮০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেন বাপ্পি। এছাড়াও, এক দিনে সর্বাধিক গান রেকর্ডিংয়ের রেকর্ডও আছে তাঁর।

১৩) ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে ১২টি সুপারহিট সিলভার জুবিলি সিনেমায় সুর দিয়ে রেকর্ড করেন তিনি।

১৪) তিনিই একমাত্র ভারতীয় সুরকার, যাঁকে BBC লন্ডনের হয়ে লাইভ পারফরম্যান্সের অনুরোধ জানান জোনাথন রস। ২০১১ সালে, আমেরিকান আইডল প্রতিযোগী শন ব্যারোজ-এর সঙ্গে তিনি 'ওয়াকিং অন লাভ স্ট্রিট' বলে একটি মিউজিক অ্যালবাম প্রকাশ করেন।

১৫) 'জাস্টিস ফর উইডোজ' নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে 'হাউজ অব লর্ডস'-এর সম্মান দেওয়া হয়।

১৬) হলিউড ছবি 'ইউ ডোন্ট মেস উইথ দ্য জোহানস'-এ বাপ্পি লাহিড়ির সুপারহিট গান 'জিমি জিমি আজা আজা' ফিচার করা হয়।

১৭) এই সময়কালের সিনেমার মধ্যে - দ্য ডার্টি পিকচার, সি কোম্পানি, চান্দনি চক টু চায়না, গুণ্ডে, হিম্মতওয়ালা, বদ্রিনাথ কি দুলহানিয়া, শুভ মঙ্গল জাদা সাবধান-এর মতো ছবিতে সুর দেন এবং গানও গেয়েছিলেন। হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর শেষ কাজ 'বাগি ৩' ছবিতে। এই ছবির ভাঙ্কাস গানে সুর দিয়েছেন ও গান গেয়েছেন।

১৮) ফিল্মফেয়ারের তরফে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান।

১৯) সোনার প্রতি তাঁর প্রেম কারুর অজানা নয়। সবসময় প্রচুর সোনার গয়না পরতে ভালবাসতেন। বলতে গেলে তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সোনায় মোড়া থাকত। তাঁর মুখের সরল হাসিটাও কম জনপ্রিয় ছিল না, সবসময় ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে থাকত।

X
Desktop Bottom Promotion