অন্ধকারই শেষ কথা নয়!

মানব জীবন যদি একটা দিনের মতো হয়, তাহলে সেই জীবনে যেমন আলো আছে, তেমনি অন্ধকারও। কোনওটাই স্থায়ী নয়, না আলো, না অন্ধকার। কিন্তু আজ এই প্রবন্ধে এমন কয়েকজন মানুষের কথা বলব যাদের জীবনে স্থায়ীভাবে অন্ধকার নেমে এসেছিল। কিন্তু মনের জোরে এরা সেই অন্ধকারকে স্থায়ী আলোতে পরিণত করেছে।

বন্ধু কেউ যদি দুঃখে দুমড়ে-মুছড়ে গিয়ে থাকো, তাহলে একবার এই প্রবন্ধে চোখ রাখো। দেখবে নিমেষে মনের হাল বদলে যাবে। শুধু তাই নয়, লেখাটা পড়ার পর আপনাদের জীবন সম্পর্কে, জীবন যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণাটাই পাল্টে যাবে। তাহলে আর অপেক্ষা কেন। চলুন বেরিয়ে পরা যাক এক অসাধারণ জার্নিতে, যা আপনি জীবনে কোনও দিন ভুলতে পারবেন না। চাইলেও না!

"ডিজেবিলিটি ইজ স্টেট অব মাইন্ড!" কারও কারও কাছে এটা শুধুই একটা কোট। কিন্তু এই প্রবন্ধে আলোচিত ৮ জন এই বক্তব্যকে সত্যি করে দেখিয়েছেন। দেখিয়েছেন হা-পা না থাকলেও ক্ষতি নেই! শরীর আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক না হলেও জীবনযুদ্ধে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন মনের জোরের। তাহলেই কেল্লাফতে!

এই ৮ জন ভারতীয় কে, তা নিশ্চয় জানতে ইচ্ছা করছে?

১. সুধা চন্দ্র:

১. সুধা চন্দ্র:

জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং বিখ্যাত এই ক্লাসিকাল ডান্সারকে কে না চেনেন। কিন্তু জানেন কি কেরালায় জন্ম নেওয়া সুধার বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর তখন সামান্য একটা অ্যাক্সিডেন্টের কারণে সুধার পা ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক পায়ে প্লাস্টার করে দেন। কিন্তু সে সময় চিকিৎসক খেয়াল করেনি, পা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে সুধার পায়ে ছোট একটা ক্ষত মতোও হয়েছে। তার উপরই প্লাস্টর করে দেওয়ার কারণে ধীরে ধীরে সেই ক্ষত থেকে সারা শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। এক সময় এমন অবস্থা হয়েছিল যে প্রান বাঁচাতে পা টা কেটে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন পরে। ওই বয়সে একটা পা হারিয়েও দমে যাননি ছোট্ট সুধা। প্রস্থেটিক পা লাগিয়ে শুরু হয় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াই। সেই লড়াই যে সুধা চন্দ্র জিতেছিলেন, তা তার কেরিয়ারের দিকে নজর ফেরালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই বন্ধুরা যারা সুধার মতোই জীবনের মারে জর্জরিত তারা দয়া করে মনের জোরটা হারাবেন না। দেখবেন তাহলেই সব সমস্যা চোখের পলকে হাফিস হয়ে গেছে।

২. রবীন্দ্র জৈন:

২. রবীন্দ্র জৈন:

জন্ম থেকেই চোখে দেখতে পান না। তাতে কী! অন্ধত্ব আমার জীবন শেষ করে দিতে পারবে না। আমি একদিন এই যুদ্ধ জিতবই জিতব। ছোটবেলাতেই এই সিন্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলন রবীন্দ্র জৈন। তাই তো হাজারো বাঁধা সত্ত্বেও ৭০-এর দশকে আমাদের দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে সাফল্যের শীর্ষে উঠতে পেরেছিলেন রবীন্দ্র। তিনি তাঁর কাজ নিয়ে কতটা প্যাশনেট ছিলেন তা একটা ঘটনা শুনলে আপনারা বুঝে যাবেন। একবার একটি হিন্দি ফিল্মের গানের রেকর্ডিং চলছিল পুরোদমে। রবীন্দ্র একের পর এক গানে সুর দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই খবর এল তাঁর বাবা মারা গেছেন। সেদিন কিন্তু কাজ ছেড়ে চলে যাননি। বরং যতক্ষণ না কাজ শেষ হয়েছে ততক্ষণ তিনি নিজের অফিসেই ছিলেন। কাজ শেষ করে তবে বাড়ি ফিরেছিলেন। সত্যিই তাঁর জীবন এবং ডেডিকেশন প্রমাণ করে, শরীর যেমনই হোক না কেন, ইচ্ছা, শ্রম এবং চেষ্টাটাই আসল।

৩. গিরিশ শর্মা:

৩. গিরিশ শর্মা:

চেনেন নাকি একে? অনেকেই হয়তো নামটাও শোনেননি, তাই না! গিরিশ শর্মা হল সেই মানুষ যিনি ছোট বয়সে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে একটা পা হারিয়েও ভারতের অন্যতম সফল ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কোনও সময় সুযোগ পেলে দেখবেন গিরিশের খেলা। অবাক হয়ে যাবেন! একটা পায়ে সারা কোর্ট দাপিয়ে বেরাচ্ছেন, পয়েন্ট পাচ্ছেন। দু পা এবং দু হাত সক্ষম থাকার পরও অনেকে এই উচ্চতায় উঠতে পারেন না, যে উচ্চতায় গিরিশ নিজেকে নিয়ে গেছেন।

৪. শেখর নায়েক:

৪. শেখর নায়েক:

এই মানুষটা ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছেন। বাকি দেশদের পিছনে ফেলে শুধু টি২০ ব্লাইন্ড ক্রিকেট ওয়াল্ড চ্য়াম্পিয়ান হননি। সেই সঙ্গে বেশ কতক সেঞ্চুরিও করেছেন। চোখে দেখতে পায় না শেখর। "তাতে কী! এটা তো পিছিয়ে পরার কারণ হতে পারে না। তাই আমি একের পর এক হার্ডেল টোপকে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। হয়তো পেরেছি।" এই হল ইন্ডিয়ান ব্লাইন্ড ক্রিকেট টিমের সহস্র শেখর নায়াকের উত্তর। সত্যিই লজ্জা লাগছে। ভগবান আমাদের সব দিক থেকে সুস্থ রেখেছেন, তবু একটা শৃঙ্গ জয় করা হল না। আর এদিকে দেখুন এরা কেমন শৃঙ্গের পর শৃঙ্গ জয় করে চলেছে।

Image Courtesy

৫. এইচ রামকৃষ্ণন:

৫. এইচ রামকৃষ্ণন:

বয়স তখন আড়াই। পোলিও-র মারে দু-পাই অকেজ হয়ে গেল। শরীরের এমন অবস্থা হওয়ার কারণে সাধারণ স্কুলে পড়ার সুযোগ মিলল না। বয়স বাড়লে চাকরিও জোটেনি। জুটেছে শুধু অপমান আর লাঞ্ছনা। তবু হেরে যাননি রামকৃষ্ণন। তিনি যে "হেরো" নন তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। টানা ৪০ বছর সাংবাদিক হিসেবে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন। আর এখন তো এস এস মিউজিক টেলিভিশন চ্যানেল নামে নিজের কোম্পানি চালান। সেই সঙ্গে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মাধ্যমে শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষদের সাহায্য করে থাকেন।

Image Courtesy

৬. প্রীথি শ্রীনিবাসন:

৬. প্রীথি শ্রীনিবাসন:

দেখে কী মনে হচ্ছে। নিশ্চয় উনি নিজের জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও নরতে পারেন না। কি তাই তো? ঠিক কথা। নরতে পারেন না। কিন্তু এক জায়গায় বসে বসেই হাজারো মহিলাদের খুশি রাখেছেন এই মানুষটি। এক সময় ক্রিকেট মাঠে দাপিয়ে বেরানো প্রীথি শ্রীনিবাসন ছিলেন তামিলনাড়ু আন্ডার ১৯ ওমেন ক্রিকেট টিমের খেলোয়াড়। একদিন সাঁতার কাটার সময় অ্যাক্সিডেন্টের সম্মুখিন হন। তারপর থেকেই শরীরের নেচের অংশ কাজ করে না। তাবু "সোলফ্রি" নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তামিলনাড়ুর লক্ষাধিক পিছিয়ে পরা মহিলাদের জীবন আলো করে চলেছেন এই মহিলা।

৭. অরুণিমা সিনদা:

৭. অরুণিমা সিনদা:

ট্রেনে যাওয়ার সময় এক চোর তাঁকে ট্রেন থেকে ফেলে দিয়েছিল। সেই ঘটনায় পায়ে এতটাই চোট লাগে যে পা বাদ দিতে হয়। তবু জীবনকে কখনও জেতার সুযোগ দেননি অরুণিমা। "পা গেছে তো কী! আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করবই।" বাস্তবিকই স্বপ্ন পূরণ করেছিল সে। কাটা পা নিয়েই পৌঁছে গিয়েছিল হিমালয়ের চূড়ায়। একবার ভাবুন। একটা পা নেই। তবু হিমালয় পাকদণ্ডী পেরচ্ছে এক মেয়ে। উফফ!!! স্যালুট অরুণিমা...স্যালুট! সত্যি অরুণিমার মতো যোদ্ধারাই প্রমাণ করে বার বার, শরীরের শক্তির থেকে মনের শক্তি থাকাটা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই কেল্লাফতে!

৮. রাজেন্দ্র সিং রাহেলু:

৮. রাজেন্দ্র সিং রাহেলু:

এই মানুষটাকে তো নিশ্চয় চেনেন। ২০১৪ সালে কমোনওয়েল্থ গেমে সিলভার জিতে রেকর্ড গড়ে দিয়েছিলেন। শরীরে নিচের অংশ জোর নেই। তবু ১১৫ কেজি ওজন তুলতে তাঁর কোনও কষ্টই হয় না। তবে এই জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না। ৮ মাস বয়সে পোলিওর কারণে পা দুটো হারানোর পর জীবন সহজ ছিল না। অনেক ধাক্কা খাওয়ার পর এক বন্ধুর অনুপ্রেরণায় বডিং বিল্ডিং শুরু করেন রাজেন্দ্র। সেই শুরু...তারপর একের পর এক ধাপ পেরিয়ে আজ ইতিহাসের পাতায় নাম উঠেছে রাজেন্দ্র সিং রাহেলু, দা বডি বিল্ডারের।

Image Courtesy

Story first published: Monday, July 31, 2017, 15:14 [IST]
X
Desktop Bottom Promotion